April 18, 2026, 5:47 pm
জাল অডিট রিপোর্টের মাধ্যমে কর ফাঁকি, সম্পদ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অতিমাত্রায় ঋণগ্রহণ ও বিদেশে অর্থ পাচার ঠেকাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্স কোম্পানি করদাতাদের রিটার্নের সঙ্গে জমা দেয়া অডিট রিপোর্টের সত্যতা যাচাই করবে। পাশাপাশি আরজেএসসিতে (যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধক) নিবন্ধিত সব কোম্পানি রিটার্ন জমা দেয় কিনা তা খতিয়ে দেখবে। এতে আয়কর আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আসবে।
সূত্র জানায়, পিকে হালদারসহ বর্তমান সময়ে আলোচিত কয়েক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা বিশ্লেষণ করে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। দেখা গেছে, জালিয়াত চক্র শুধু কাগজ-কলমে প্রতিষ্ঠান গঠন করে ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কোম্পানি খোলার ক্ষেত্রে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই বৈধ টিআইএন পাওয়া যায়নি। জাল টিআইএন বানিয়ে কোম্পানি খুলে ভুয়া অডিট রিপোর্ট জমা দিয়ে ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এসব বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমকে জানানো হলে তিনি টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।
সূত্র জানায়, আরজেএসসিতে বর্তমান এক লাখ ৭৬ হাজার ৪০০ কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ হাজার কোম্পানির করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) রয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জাল টিআইএন ব্যবহার করেছে। আর বৈধ টিআইএনধারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার রিটার্ন জমা দেয়। কোম্পানি করদাতাদের রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে অডিট রিপোর্ট জমার বাধ্যবাধকতা আছে। হিসাববিদদের সংগঠন ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের (আইসিএবি) তথ্য মতে, তাদের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সব মিলিয়ে সাড়ে ১৬ হাজার প্রতিষ্ঠানের অডিট করে। অর্থাৎ সাড়ে ১৮ হাজার প্রতিষ্ঠানেরই অডিট রিপোর্ট জাল। এ জাল অডিট রিপোর্ট দিয়ে রিটার্ন জমা দেয়ায় বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, এনবিআরের টাস্কফোর্স বিশেষায়িত সফটওয়্যারের মাধ্যমে আরজেএসসিতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করবে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর কর অঞ্চলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আলাদা করে আইসিএবির ডাটাবেজের সঙ্গে তা যাচাই করা হবে। এক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান জাল অডিট রিপোর্ট দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে সেগুলোর বিরুদ্ধে আয়কর আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান আরজেএসসির নিবন্ধন নিয়েছে, কিন্তু রিটার্ন জমা দিচ্ছে না, মাঠ পর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করা হবে।
টাস্কফোর্সের এক সদস্য জানান, সিআইসির অনুসন্ধানে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া গেছে যেগুলো কর ফাঁকি দিতে অডিট রিপোর্টে মুনাফা কম দেখিয়েছে। আবার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ পেতে প্রতিষ্ঠানটি সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখিয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিবন্ধিত সব কোম্পানি করদাতার কাছ থেকে রিটার্ন নিশ্চিত করা গেলে কর্পোরেট ট্যাক্স ৩-৫ শতাংশ বাড়বে। এর বড় বিষয় হচ্ছে, জাল অডিট রিপোর্টের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ নেয়া বন্ধ হবে। টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের কারণে এ বছর অন্তত এক হাজার কোটি টাকা কর্পোরেট ট্যাক্স আদায় বাড়বে। তবে পুরো সুফল আগামী বছর থেকে পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে আইসিএবির সভাপতি মোহাম্মদ ফারুক বলেন, অডিট রিপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিভিন্ন ধরনের কথা শোনা যায়। সরকারি সংস্থার তথ্যেও পার্থক্য আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইসিএবি একটি ডাটাবেজ করছে। এতে এনবিআরকেও যুক্ত করা হবে। সেই ডাটাবেজে আইসিএবির সদস্য অডিটররা যেসব প্রতিষ্ঠানের অডিট করবেন তার তথ্য উল্লেখ করা হবে। এতে অনেক ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে। সহজে জাল অডিট রিপোর্টও শনাক্ত করা যাবে।